স্বাধীনতা দিবস : রচনা - Sadinota Dibos - Rochona

      1. ভূমিকা
      2. ঐতিহাসিক পটভূমি
      3. ঐতিহাসিক পটভূমির ধারাক্রম
      4. অপারেশন সার্চলাইট
      5. বাঙালিদের প্রতিরোধ ও স্বাধীনতা অর্জন
      6. উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য
      7. বর্তমান বাস্তবতা
      8. সংকট উত্তরণের উপায়
      9. উপসংহার

                                                                                                                  স্বাধীনতা দিবস : রচনা - Sadinota Dibos - Rochona

                                                                                                                  স্বাধীনতা দিবস রচনা

                                                                                                                  • ভূমিকা: 
                                                                                                                  ‘স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায়’
                                                                                                                  -রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়।
                                                                                                                  মানুষ জন্মগতভাবেই স্বাধীন। তার এই জন্মগত অধিকার যখন অন্যের দ্বারা লুণ্ঠিত হয় তখনই সে প্রতিবাদ করে ওঠে। সর্বস্বের বিনিময়ে নিজের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হয়। ২০০ বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের পর বাঙালি জাতিকে দীর্ঘ ২৪ বছর পাকিস্তানি শোষকদের বর্বরোচিত শোষণের নির্মম শিকার হতে হয়। পরাধীনতার শৃংখলে আবদ্ধ বাঙালি ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে মৃত্যুপণ সংগ্রাম শুরু করে। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ; তিরিশ লক্ষ প্রাণ আর দুই লক্ষ মা-বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। বিশ্ব মানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম একটি দেশ বাংলাদেশ। ২৬ মার্চ স্বাধীনতার পথে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর এই গৌরবময় দিনটিই বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘মহান স্বাধীনতা দিবস’ হিসেবে সমাদৃত।

                                                                                                                  • ঐতিহাসিক পটভূমিঃ
                                                                                                                  বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ঐতিহাসিক পটভূমি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের স্বপ্নবীজ মূলত বপন করা হয়েছিল সেই ১৯৪৭ সালে, ব্রিটিশদের ভারত ত্যাগের সময়ই। পরবর্তীতে প্রতিটি ক্ষেত্রেই ক্রমাগত শোষণ, নিপীড়ন, বৈষম্যমূলক আচরণ, ন্যায্য অধিকার প্রদানে অস্বীকৃতি প্রভৃতি আন্দোলনের যাত্রাকে ত্বরান্বিত করে। আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার এই পরোক্ষ সংগ্রাম ১৯৭১ এ এসে অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। অনিবার্য মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে সৃষ্টি হয় ‘বাংলা’ ভূখন্ড।

                                                                                                                  • ঐতিহাসিক পটভূমির ধারাক্রমঃ
                                                                                                                   ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে ব্রিটিশ-বেনিয়াদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়ে ভারত-পাকিস্তান দু’টি আলাদা রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে যোজন-যোজন দূরত্ব সত্ত্বেও শুধুমাত্র ধর্মের দোহাই দিয়ে পাকিস্থান ও বাংলাদেশ নিয়ে গঠিত হয় নবগঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তান। অদ্ভূত দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্ট পাকিস্তানের শাসকদের অনাচার-অত্যাচার আর সর্বক্ষেত্রে চরম বৈষম্য-বঞ্চনার স্বীকার হয় বাঙালি জাতি। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কেবল অর্থনৈতিক শোষণই নয় বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ওপরও নিপীড়ন শুরু করে। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করে। তখনই ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠনের মধ্য দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদের প্রতি পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণের অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ ঘটতে শুরু করে।১৯৫২ সালে উর্দুকে আবারও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দিলে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রজনতা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ২১ ফেব্রুয়ারি বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল নিয়ে রাস্তায় নামে। বর্বর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী মিছিলে গুলি চালালে শহিদ হন রফিক, জব্বার, সালাম, বরকতসহ আরও অনেকে। শহিদদের এই পবিত্র রক্তই যেন বাঙালির হৃদয়ে স্বাধীন লাল-সবুজের পতাকার ছবি এঁকে দেয়।১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করে। মুসলিম লীগের অসহায় ভরাডুবিতে নড়বড়ে হয়ে পড়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতার ভিত। ১৯৫৬ সালে পুনরায় সরকারি ভাষায় বিতর্ক, আইয়ুব খানের অপশাসন, পাঞ্জাবি ও পশতুনদের ঋণ বাঙালিদের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেয়া প্রভৃতি কারণে বাঙালিদের মনের ক্ষোভ ক্রমশ বাড়তে থাকে।১৯৬৬ সালে বাঙালির স্বাধিকারের দাবিতে ঐতিহাসিক ‘ছয়-দফা’ দাবি উত্থাপিত হয়। গণবিক্ষোভ প্রতিহত করতে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সামরিক শাসনের মাধ্যমে স্বাধীনতাকামী জনগণের ওপর চালাতে থাকে অত্যাচার, নিপীড়ন। ১৯৬৮ সালে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের পুরোধা ব্যক্তিত্ব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানাকে মিথ্যা ও সাজানো ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’য় গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু প্রবল গণআন্দোলনের মুখে পাকিস্তানি অপশক্তি ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধুসহ অন্যান্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে ছেড়ে দেয়। এমনকি প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে জয়লাভ করে। দফায় দফায় বৈঠক করার পরও ক্ষমতালিপ্সু শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে কালক্ষেপণ করতে থাকে। এমতাবস্থায় ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বিশাল সমাবেশের ডাক দেন। সমাবেশের ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি- ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম’ বলে যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান। এমন একটি উদাত্ত আহ্বানের জন্যই এতদিন যেন অপেক্ষা করেছিল বাঙালি। সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে এই ডাক। সর্বত্র শুরু হয় তুমুল আন্দোলন।

                                                                                                                  • অপারেশন সার্চলাইটঃ
                                                                                                                  ২৫ মার্চের অন্ধকার রাতে বর্বর পাকিস্তানি পশুশক্তি নিরস্ত্র-ঘুমন্ত বাঙালির ওপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। এশিয়া টাইমসের ভাষ্য অনুযায়ী, "Indians are bastards anyway". সামরিক বাহিনীর বড় বড় অফিসারদের নিয়ে বৈঠকে ইয়াহিয়া খান ঘোষণা করেন- “তিরিশ লক্ষ বাঙালিকে হত্যা কর, তখন দেখবে তারা আমাদের হাত চেটে খাবে।” সে পরিকল্পনা মতোই ২৫ মার্চের রাতে পাকিস্তানি আর্মি অপারেশন সার্চলাইট আরম্ভ করে যার উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দেয়া। এরই অংশ হিসাবে সামরিক বাহিনীর বাঙালি সদস্যদের নিরস্ত্র করে হত্যা করা হয়, ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী সমাজ নিধন করা হয় এবং সারা বাংলাদেশে নির্বিচারে সাধারণ মানুষ হত্যা করা হয়।

                                                                                                                  • বাঙালিদের প্রতিরোধ ও স্বাধীনতা অর্জনঃ 
                                                                                                                  ২৫ মার্চ রাতেই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। গ্রেফতার হওয়ার আগে ২৬মার্চের প্রথম প্রহরে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে যান। তাঁর অনুপস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধের অন্যান্য সংগঠকবৃন্দ অস্থায়ী মুজিবনগর সরকার গঠন করে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। সর্বস্তরের মানুষের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম, বন্ধুরাষ্ট্রসমূহের সর্বাত্মক সহায়তা, বিশ্ব গণমাধ্যমের ইতিবাচক ভূমিকা তদুপরি তিরিশ লক্ষ শহিদ ও দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অবশেষে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ।

                                                                                                                  • উদ্দেশ্য ও তাৎপর্যঃ
                                                                                                                  স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য ছিল আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জন ও অসাম্প্রদায়িক, কল্যাণমুখী, মানবিক, প্রগতিশীল স্বতন্ত্র গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। মানুষের মৌলিক অধিকার ও ন্যায়সংগত অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে জাতীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠা, শোষণ, বৈষম্য, অন্যায়ের অবসান ঘটিয়ে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত একটি সুখী-সমৃদ্ধ সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ছিল স্বাধীনতার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।জাতীয় জীবনে স্বাধীনতা দিবসের তাৎপর্য অপরিসীম। এই দিনটি বাঙালির জীবনে বয়ে আনে একই সঙ্গে আনন্দ-বেদনার অম্ল-মধুর অনুভূতি। একদিকে হারানোর কষ্ট অন্যদিকে প্রাপ্তির আনন্দ। তবে শেষ পর্যন্ত সর্বস্ব হারিয়েও স্বাধীনতা প্রাপ্তির অপার আনন্দই বড় হয়ে ওঠে প্রতিটি বাঙালির কাছে। গৌরবোজ্জ্বল এই দিনটি প্রতিবছর আসে আত্মত্যাগ ও আত্মপরিচয়ের বার্তা নিয়ে। স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদের দায়িত্ব-কর্তব্য। নব উদ্যমে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা ও দিকনির্দেশনা নিয়ে আসে এই দিন।

                                                                                                                  • বর্তমান বাস্তবতাঃ 
                                                                                                                  ‘কি দেখার কথা কি দেখছি. . . তিরিশ বছর পরেও আমি স্বাধীনতাটাকে খুঁজছি. . .’ স্বাধীনতার স্বপ্ন আর বর্তমান বাস্তবতা পর্যালোচনা করলে গায়ক হায়দার হোসেনের এই গানটিই যেন করুণ সুরে বেজে ওঠে মনের কোণে। তিরিশ নয়, তেতাল্লিশ বছর পেরিয়ে গেছে স্বাধীনতার। সুখী-সমৃদ্ধ শান্তিপূর্ণ সমাজের স্বপ্ন পূরণ হয়নি আমাদের। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, বেকারত্বের দুর্বিপাকে এখনও আমরা ঘুরপাক খাচ্ছি। মূল্যবোধের অবক্ষয়, হিংসাত্মক অপরাজনীতি, লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতি, সীমাহীন দুর্নীতি প্রভৃতি স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নের লাগাম টেনে ধরে আছে। স্বাধীনতার চেতনা যেন ম্লান হয়ে যেতে বসেছে আর আমরা ক্রমশই যেন পিছিয়ে যাচ্ছি।

                                                                                                                  • সংকট উত্তরণের উপায়ঃ 
                                                                                                                  সংকট উত্তরণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে আশার কথা হলো, আমাদের বর্তমান প্রজন্ম স্বাধীনতার ব্যাপারে যথেষ্ট আগ্রহী। এই প্রজন্মকে স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে দেশকে এগিয়ে নেয়ার দীক্ষায় দীক্ষিত করতে হবে। এ জন্য এদের হাতে স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস তুলে দেয়া জরুরি। জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে সঠিক ইতিহাস সংগ্রহের মাধ্যমে ইতিহাসবিকৃতি রোধের মাধ্যমে তা সম্ভব হতে পারে। দল কিংবা ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে ওঠে কল্যাণমুখী রাজনীতির চর্চা করতে হবে।

                                                                                                                  • উপসংহার: 
                                                                                                                  পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত পর্যন্ত
                                                                                                                  ঘোষণার ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তুলে,
                                                                                                                  নতুন নিশান উড়িয়ে,
                                                                                                                  দামামা বাজিয়ে দিগি¦দিক
                                                                                                                  এই বাংলায় তোমাকে আসতেই হবে হে স্বাধীনতা।
                                                                                                                  কবি শামসুর রাহমানের মতো প্রতিটি বাঙালির আত্মপ্রত্যয়ী আহ্বানে এসেছে স্বাধীনতা। অর্জিত এই স্বাধীনতা রক্ষা ও এর চেতনা বাস্তবায়নে সব ধরণের সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে ওঠে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গড়ার কাজে ব্রতী হতে হবে আমাদের।

                                                                                                                  [Sadinota Dibos - Rochona]

                                                                                                                  শেষ কথা

                                                                                                                  আশা করি এই কনটেন্টটি আপনাদের পছন্দ হয়েছে। আপনার পছন্দের আরো পোস্ট পড়তে আমাদের ওয়েবসাইটটি ভিজিট করুন। আপনাদের মতামত কমেন্ট বক্সে জানাতে পারেন।

                                                                                                                  আরও পড়ুনঃ-

                                                                                                                  Next Post Previous Post
                                                                                                                  No Comment
                                                                                                                  Add Comment
                                                                                                                  comment url